
আপসহীন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আর নেই
আপসহীন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আর নেই
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
খালেদা জিয়ার জানাজা বুধবার দুপুর ২টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা পড়াবেন বায়তুল মোকাররমের খতিব আবদুল মালেক। এরপর তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হবে।
এদিকে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন অন্তর্বর্তী সরকার। পাশাপাশি আগামীকাল বুধবার সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়াও খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সাতদিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি।
মিথ্যা মামলায় ২৫ মাসের কারাবাসে বিপন্ন হয় খালেদা জিয়ার জীবনমিথ্যা মামলায় ২৫ মাসের কারাবাসে বিপন্ন হয় খালেদা জিয়ার জীবন
খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়ি জেলায় (বর্তমান দিনাজপুর) একটি সম্ভ্রান্ত ও সচ্ছল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন ইস্কান্দার মজুমদার। মাতা ছিলেন তৈয়বা মজুমদার। এই পরিবারের আদি বাড়ি ছিল দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ফেনী জেলায়। খালেদা জিয়ার ডাকনাম পুতুল। তার বড় দুই বোন এবং ছোট দুই ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় বোন ও এক ভাই বেঁচে নেই। পিতা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। ভাইবোনের জীবন আনন্দ ও সুখের ছিল। খালেদা জিয়া লেখাপড়া করেন দিনাজপুর গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে। ১৯৬০ সালে তৎকালীন সেনা অফিসার ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের দুই ছেলে তারেক রহমান পিনো ও আরাফাত রহমান কোকো। ২০১৫ সালে কোকোর অকাল মৃত্যু হয়।
১৯৮১ সালের ৩০ মের সেই কালো রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর একটি কুচক্রী মহলের হাতে প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট জিয়া মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। এই করুণ মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া তার প্রেমময়ী স্বামীকে চিরতরে হারালেন। জিয়াউর রহমানের অবর্তমানে তার তেজোদীপ্ত নেতৃত্ব থেকে বিএনপি যখন বঞ্চিত হয়েছে, তখন দলের নির্ভরযোগ্য কোনো উত্তরাধিকারী নির্ধারিত ছিল না। ফলে খালেদা জিয়াকে একরকম বিএনপির নেতৃত্ব কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হতে হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর দলের নেতাকর্মী ও দেশের মানুষের প্রবল আগ্রহ ও চাপে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেন। রাজনীতিতে অভিসিক্ত হয়ে তিনি দলের সব সারির নেতৃত্বকে সুসংঘবদ্ধ করেন এবং দলকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্তৃত করে সর্বসম্মতভাবে দলের প্রধান নির্বাচিত হন। স্বামীর মৃত্যুতে শোকার্ত অবস্থায় খালেদা জিয়া এভাবেই বিএনপির হাল ধরেন।
১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এরপর ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৪ সলের ১০ মে দলীয় নির্বাচনে হন পার্টির প্রথম নির্বাচিত চেয়ারপারসন। এরপর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দলীয় এই পদে আসীন ছিলেন খালেদা জিয়া।
এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তার দল যেমন জনগণের ভোটে বিস্ময়করভাবে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, তেমনি ২০০১ সালের ১ অক্টোবর চারদলীয় ঐক্যজোট নীরব ভোট বিপ্লবে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হয়। ২০০৭ সালে ১/১১-এর জরুরি সরকার দেশকে রাজনীতিশূন্য করতে যে পদক্ষেপ নেয়, ওই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ করে দেন খালেদা জিয়া। শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদ এবং বর্তমান অবৈধ সময়ের ভয়াবহ ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়েও অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেখ হাসিনার ধূর্ত কর্তৃত্ববাদী শাসন তাকে রাজনীতি থেকে একেবারে সরিয়ে দেওয়ার নীল নকশা বাস্তবায়ন করে। এরই অংশ হিসেবে ভিত্তিহীন মামলায় সাজা দিয়ে তাকে জেলে বন্দি ও নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে খালেদা জিয়া প্রথম দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাকে শপথ পাঠ করান। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ষষ্ঠ সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা হিসেবে ১৯৯৬ সালের মার্চে দ্বিতীয় দফায় তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার ওই সরকারটি ছিল সংক্ষিপ্ত সময়ের। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল সংসদে পাস করার জন্য সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে একটি নিয়মরক্ষার নির্বাচন হিসেবে ওই নির্বাচন করা হয়। আর ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হওয়ার পর ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
এর আগে মঙ্গলবার দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত করেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
তিনি জানান, হাসপাতালে খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, ছেলের বউ ডা. জোবায়দা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান, ছোট ছেলের বউ শার্মিলী রহমান সিঁথি, ছোট ভাই শামীম এসকান্দার, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী, বড় বোন সেলিনা ইসলামসহ সকল আত্মীয়-স্বজন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের সব সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
দেশের রাজনীতিতে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত এই বরেণ্য রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে জাতি এক অভিভাবককে হারাল। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও নারী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি যুগের সমাপ্তি ঘটল।
গত ২৩ নভেম্বর খালেদা জিয়াকে শেষবারের মতো রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এক মাসের কিছু বেশি সময় ধরে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন।